মিথ্যা (অনুগল্প)

হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। ভাবতেই পারি নি এরকম আচমকা ঝুম বৃষ্টি আসবে। আজ আমার কোর্টের হাজিরা। হিন্দু হলে বলে বসতাম, কোন জন্মে যে পাপ করেছি। তার মাশুল একেবারে কড়ায় গন্ডায় দিচ্ছি। মিছিলে গিয়েছিলাম, গণজাগরণ মঞ্চ টার্গেট করে দুএকটা ঢিল ছোড়েছিলাম কি না, কাঁধে তিন তিনটা মামলা। লাইফটা একেবারে হালুয়া বানিয়ে ফেলছে। হাজিরা দিতে দিতে একেবারে ছাতু। এমনিতেই আল্লাহর বারো মাস বেকার থাকি। এই চব্বিশ পচিশ বছর বয়সে কি কোন ছেলে মার কাছ থেকে টাকা চায়?
উকিলের সহকারী মানে মরির ফোন করেছে। ভাইজান আপনে কই?
আমি বড় বেকায়দায় পড়ি। গত দুদিন ধরে বারবার ফোন দিয়েছে। পইপই করে বলেছে, ভাই, কাল আপনার ৬৯ নং মামলার হাজিরা। সাব তাড়াতাড়ি কোর্টে বসে পড়বে। আপনি সকাল দশটার আগে পৌঁছে যাবেন। এখন বাজে সাড়ে দশটা। আমি এখনো বাসায়। উদার আকাশকে দেখছি। কোনো কবি সাহিত্যিকের চোখে দেখছি না। একটি উ™£ান্ত, দিশেহারা তরুণের চোখে তাকিয়ে আছি।
আমার বড় ভাই বাসার ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছেন। তার মোটামুটি সাইজের একটি বাক্স আছে। তার ভেতর হাতুড়ি, রেঞ্চ-বেঞ্চ হাবিজাবি এইসব আছে। আমি তার ঘরে ঢুকে কান থেকে মোবাইলটা মাটিতে রেখে বাক্সটা খুলি। হাতুড়িটা বের করে বারান্দায় আসি। বারান্দায় নতুন গ্রিল লাগানো হয়েছে। গ্রিল লাগানোর পক্ষে আমি ছিলাম না। বলা যায় ঘোর বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু আজ আমার শ্রদ্ধেয় ভাইজান এবং আম্মাজানকে মনে মনে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। সচরাচর যেরকম আমার কথা কখনো অ্যাকসেপ্ট হয় না, এটাও সেরকম হওয়ার দরুণ।
আমি বাম হাত দিয়ে কানে আবারো মোবাইলটা ধরলাম। জোর গলায় হ্যালো বললাম। ডান হাত দিয়ে হাতুড়ি দিয়ে দুতিনটা ঘা বসিয়ে দিলাম বারান্দার গ্রিলে।
মরিরের অত্যাধিক বিরক্তির আওয়াজ পেলাম। ভাই, আপনি কথা বলেন না কেন?
আমি বললাম, কিভাবে রে ভাই বলব? বৃষ্টিতে একেবারে ছাতু হয়ে গেলাম। বাসা থেকে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বের হই। কত কষ্ট করে একটা গাড়িতে সিট পেলাম। সেই গাড়িটা মাঝ পথে এসে... এই অবস্থা। শুনতে পাচ্ছ?
ভাই কি হয়েছে?
আরে বেটা কোর্টে এসে বয়রা হয়ে গেলে নাকি। টাংটুং আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ না? গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল।
আচ্ছা ভাই তাড়াতাড়ি আসো। বাসায় একটা ছাতাও রাখো না নাকি? কিপ্টের...।

আমি অতি দ্রুত লাইন কেটে ফেলি। সে কি বলবে সেটা জানি। আমার মুখস্ত। সবার কাছে কোর্টের হিসাব নিকাশ খুব সুন্দর এবং প্রাঞ্জল করে উপস্থাপন করে দাবী-দাওয়া আদায় করতে পারলেও আমার কাছে সেটা কখনো অ্যাকসেপ্ট হয় না। তবে চিন্তার বিষয় হলো, আমার মিথ্যাটা ধরে ফেলল নাকি। আমি এখনো এই লাইনে নতুন। মিথ্যাটা সত্যি করে উপস্থাপন করতে আরো কিছুদিন লাগবে। তবে ব্যাপার না। হয়ে যাবে একদিন। পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।

No comments

Free and Premium Blgger Templates
Powered by Blogger.